সাজিদুর রহমান :
দাম্পত্য জীবন হলো বিবাহ বা স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে শুরু হওয়া যুগল জীবন। এটি এমন একটি যৌথ যাত্রা, যেখানে একজন নারী ও একজন পুরুষ আইনগত ও সামাজিকভাবে একত্রিত হয়ে একসঙ্গে বসবাস করেন। দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি- ভালোবাসা ও মায়া, একে অপরের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও স্নেহের সম্পর্ক । পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের মতামতের মূল্য দেওয়া ও সম্মান করা। সহযোগিতা- বিপদে-আপদে ও সুখ-দুঃখে একে অপরের পাশে থাকা। মানিয়ে চলা- ছাড় দেওয়ার মানসিকতা ও সমঝোতা। দাম্পত্য জীবন সুখের করার উপায়। সময় দেওয়া- কর্মব্যস্ততার মাঝেও সঙ্গীকে সময় দেওয়া। ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি-ছোটখাটো ভুল ক্ষমা করা ও একে অপরকে সহজভাবে গ্রহণ করা।
দাম্পত্য জীবনের স্থায়িত্ব কিংবা সুখের পরিমাপক হিসেবে স্বামী-স্ত্রীর বয়সের ফারাক কতটা হওয়া উচিত—এমন প্রশ্নের কোনো একরৈখিক উত্তর নেই। সমবয়সী যুগল থেকে শুরু করে এক বা দেড় দশকের ব্যবধানেও গড়ে ওঠে অটুট বন্ধন; আবার অল্প ব্যবধানেও তৈরি হতে পারে দূরত্ব।
দিনশেষে দুজনের আন্তরিকতা, যত্ন ও মানসিক বন্ধনই মুখ্য—আর তা নিশ্চিত থাকলে বয়স কেবলই একটি সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।
মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বয়সের নৈকট্য হয়তো সমসাময়িক ভাবনার মিল এনে দেয়, তবে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও শান্তিময় দাম্পত্যের আসল চাবিকাঠি নিহিত থাকে পরস্পরের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধা, সমঝোতা এবং মানসিক পরিপক্বতার গভীরতায়।
বয়সের ব্যবধান ভেদে সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিতে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ৫ থেকে ৭ বছরের ব্যবধান থাকলে মানসিক পরিপক্বতা ও সমঝোতায় ভালো ভারসাম্য তৈরি হয় এবং অযৌক্তিক মতবিরোধ কমে আসে।
অন্যদিকে ১০ বছরের ব্যবধান থাকলেও দুজনের মূল্যবোধ ও জীবনের লক্ষ্য অভিন্ন হলে তা সম্পর্কে কোনো অন্তরায় হয় না; তবে এক্ষেত্রে কোনো এক পক্ষের একক কর্তৃত্ব যেন তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
ব্যবধান যখন ২০ বছর বা তার বেশি হয়, তখন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিংবা জীবনধারায় অমিল দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যদিও গভীর বোঝাপড়ার মাধ্যমে এমন বহু সম্পর্ক সফলভাবে টিকে থাকার নজির রয়েছে।
দাম্পত্য জীবনের দীর্ঘস্থায়িত্ব কেবলমাত্র একটি সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। ব্যবধান ৫-৭ বছর হওয়ার পরও অনেক দম্পতিকে বৈবাহিক জটিলতায় পড়তে দেখা যায়। একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাস, অকপট যোগাযোগ, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পাশে থাকা এবং লক্ষ্য ও ভাবনার সামঞ্জস্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুটি মানুষের মানসিক নৈকট্য ও দায়বদ্ধতাই একটি সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে।
তবে সন্তান গ্রহণের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বয়স একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, পুরুষের সন্তান জন্মদানের আদর্শ সময় ২১ থেকে ৩৫ বছর। ৩৫ বছরের পর শুক্রাণুর গুণমান কমতে থাকে এবং ৪০ পেরোলে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে; এমনকি ৫০-এর পর অনেকেই প্রাকৃতিকভাবে পিতা হওয়ার সক্ষমতা হারান। নারীদের ক্ষেত্রে বিশের কোঠার শুরুর দিক এবং ২৫ থেকে ২৯ বছর মা হওয়ার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সময়।
ত্রিশোর্ধ্ব নারীদের ক্ষেত্রে প্রজননক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায় এবং চল্লিশের পর গর্ভধারণ মা ও শিশু উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ফলে সন্তান প্রত্যাশী হলে পুরুষের বয়স ৫০-এর নিচে এবং নারীর বয়স ৪০-এর নিচে থাকা ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়।
গবেষণাতেও বয়সের প্রভাবের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। ২০১৭ সালের একটি অস্ট্রেলীয় গবেষণা অনুযায়ী, যেসব দম্পতির বয়সের ফারাক ১ থেকে ৩ বছর এবং পুরুষ সঙ্গী বয়সে বড়, তাদের সন্তুষ্টির মাত্রা বেশি।
আবার বিয়ের ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে যাদের বিচ্ছেদ ঘটে, তাদের বড় অংশের ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধান ছিল ৭ বছর বা তার বেশি। তবে এটি কোনো চূড়ান্ত নিয়ম নয়; বড় ব্যবধান থাকার পরও বহু বছর সুখে সংসার করছেন এমন দৃষ্টান্তও অঢেল।
এমনকি নারীর বয়স পুরুষের চেয়ে বেশি হওয়া সত্ত্বেও বহু দম্পতি সফল জীবন কাটাচ্ছেন।
ভোগ সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মডেল ইলিলি জানান, তার ৫৩ বছর বয়সী বাবা ভেঙ্কট রমণ ও ৪৩ বছর বয়সী মা পূর্ণিমা দীর্ঘ ২১ বছর ধরে সুখী দাম্পত্যে আছেন; যেখানে বয়সের ফারাক কোনো সমস্যা তৈরি করেনি।