প্রকাশ :: ১৭ মে ২০২৬, ১৩:৫৬

ফরাসি বিপ্লব আর রেস্তোরাঁ জন্মের আখ্যান


সংযুক্ত ছবি

প্যারিসের পালে-রোয়্যাল এলাকায় অবস্থিত ‘লে ত্রোয়া ফ্রের প্রোভঁসো’ রেস্তোরাঁ। ১৮৪২ সালে ইউজেন লামির আঁকা খোদাইচিত্র। সংগৃহীত

বাংলা ভিউ ডেস্কঃ ফরাসি বিপ্লব আর রেস্তোরাঁ জন্মের আখ্যান । আঠারশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। প্যারিসের রাস্তাগুলো তখন আজকের মতো ঝকঝকে আলোকোজ্জ্বল নয়। সরু অলিগলি দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নর্দমার দুর্গন্ধ, আর অন্ধকার চিরে মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে ঘোড়ার খুরের শব্দ। আপনি যদি সেই সময়ে কোনো পর্যটক হিসেবে প্যারিসে পা রাখতেন, তবে আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলিটি খুব একটা সুখকর হতো না। বিশেষ করে খাবারের ব্যাপারে। আজকের দিনে আমরা যে ‘ফাইন ডাইনিং’ বা আয়েশ করে রেস্তোরাঁয় বসে মেনু দেখে ফরমায়েশ দেওয়ার কথা ভাবি, ১৭৬০-এর দশকের আগে তার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আপনি যদি ধনী কোনো অভিজাত ব্যক্তির বন্ধু না হতেন, তবে আপনার কপালে জুটত সরাইখানার বাসি মাংস আর পানসে তরল। কিন্তু ঠিক তখনই প্যারিসের এক কোণে শুরু হলো এক নীরব বিপ্লব। আগুনের শিখা শুধু কামারশালায় নয়, জ্বলল উনুনেও। জন্ম নিল এমন এক ধারণা, যা বদলে দিল পৃথিবীর মানুষের খাওয়ার ধরণ। ফ্রান্স শুধু গণতন্ত্রের নতুন সংজ্ঞাই দেয়নি, বিশ্বকে শিখিয়েছিল কীভাবে থালায় আভিজাত্য পরিবেশন করতে হয়। ১৭২৭ সালের কথা। জার্মান পণ্ডিত জোয়াকিম ক্রিস্টোফ নেমেতিজ প্যারিস ভ্রমণে এসে রীতিমতো বিরক্ত হয়ে লিখেছিলেন, “ধনী আর অভিজাতদের জন্য তো বাড়িতেই নামিদামি বাবুর্চি থাকে, তারা রাজকীয় ভোজ খায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের অবস্থা করুণ। হয় তারা কাঁচা মাংস চিবোচ্ছে, নয়তো দিনের পর দিন একই পানসে খাবার খেতে বাধ্য হচ্ছে।” সেসময় খাওয়ার জায়গা বলতে ছিল সরাইখানা, যেখানে ঘোড়া আর মানুষ অনেকটা একই মানের খাবার পেত। ছিল ক্যাফে, যেখানে শুধু কফি আর মদ মিলত। কোনো শৌখিনতা ছিল না, ছিল না পছন্দের স্বাধীনতা। ‘রেস্তোরাঁ’ শব্দটির জন্মও তখন হয়নি। আজকের যে শব্দটিকে আমরা বিলাসের সমার্থক মনে করি, তার আদি অর্থ ছিল স্রেফ ঝোল বা স্যুপ। ১৭৬৫ সাল। প্যারিসের র্যু দে পুলি এলাকায় মাথুরিন রোজে দ্য শঁতুয়াজো নামের এক ফরাসি উদ্যোক্তা অদ্ভুত এক কাজ করে বসলেন। তিনি একটি পুরনো বেকারিতে মার্বেল পাথরের ছোট ছোট টেবিল বসালেন। সেখানে তিনি পরিবেশন করতে শুরু করলেন মুরগির হাড়ের ঘন ঝোল বা ব্রোথ, নোনতা মুরগির মাংস আর টাটকা ডিম। রোজে শুধু একজন ব্যবসায়ী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন পরোপকারী ও দার্শনিক। তিনি তার দোকানের দরজার ওপর লিখে দিলেন ল্যাটিন ভাষায় এক বাক্য, যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়: “এসো আমার কাছে, তোমাদের যাদের পাকস্থলীতে ব্যথা, আমি তোমাদের আরোগ্য দান করব।” তার এই ‘আরোগ্য’ বা ‘রিস্টোর’ করার ধারণা থেকেই জন্ম নিল ফরাসি শব্দ ‘রেস্তোরে’, আর তা থেকেই আজকের ‘রেস্টুরেন্ট’। মজার ব্যাপার হলো, রোজে চাইলেন খাবারকে সবার নাগালে আনতে। তার এই চিন্তা ছিল তখনকার কঠোর রাজতান্ত্রিক ও শ্রেণিবিন্যস্ত সমাজের বিরুদ্ধে এক প্রকার সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক জায়গা যেখানে মানুষ একা বসেও শান্তিতে খেতে পারবে, যা সেসময় কল্পনার বাইরে ছিল। দার্শনিক ডেনিস ডিডরো ১৭৬৭ সালে সেখানে খেয়ে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, “সবাই এর প্রশংসা করছে। এখানে আপনি একা বসে আপনার নিজের পছন্দের খাবারটি উপভোগ করতে পারেন।” রোজের আইডিয়াটা ছিল অনেকটা বীজের মতো, যা মহীরুহ হয়ে উঠল ঠিক ১৫ বছর পর। মঞ্চটি ছিল ‘পালে-রয়্যাল’। একসময়ের রাজপ্রাসাদ তখন হয়ে উঠেছে প্যারিসের প্রাণকেন্দ্র। থিয়েটার, বইয়ের দোকান, জুয়ার আড্ডা আর ক্যাফেতে গিজগিজ করত শহর। ১৭৮৬ সালে এখানেই আঁতোয়া বোভিলিয়ার্স নামে এক জাঁদরেল বাবুর্চি খুললেন ‘লা গ্রান্দ তাভের্ন দ্য লোঁদ্র’। বোভিলিয়ার্স ছিলেন ভবিষ্যৎ রাজা অষ্টাদশ লুইয়ের বাবুর্চি। তিনি রোজের সেই ‘সাধারণ’ ধারনাকে নিয়ে গেলেন আভিজাত্যের শিখরে। তিনি বুঝলেন, সাধারণ মানুষ কেবল পেট ভরতে চায় না, তারা চায় একটু রাজকীয় অভিজ্ঞতা। তার দোকানে ছিল চকচকে মেহগনি কাঠের টেবিল, দেয়ালে বড় বড় আয়না আর ঝকঝকে ঝাড়লন্ঠন। ১৮২০-এর দশকের এক ভ্রমণ নির্দেশিকায় এই জায়গাগুলোর বর্ণনা পাওয়া যায় রূপকথার মতো করে। চারদিকে আয়নার খেলা, দামি চীনামাটির চুলা, আর কাউন্টারে বসে থাকা সুন্দরী রমণী- সব মিলিয়ে রেস্তোরাঁ হয়ে উঠল ‘দেখার এবং দেখানোর’ জায়গা। বোভিলিয়ার্সের মেনু কার্ডটি ছিল দেখার মতো। ১৭৯৮ সালের এক পর্যটকের বয়ানে জানা যায়, সেখানে ১৭৮টি পদের তালিকা ছিল! ১০ রকমের স্যুপ, ১২ রকমের স্টার্টার, ৩৬ রকমের ডেজার্ট- কী ছিল না সেখানে? গ্রাহকরা প্রথমবারের মতো অনুভব করলেন, তারা কেবল খাদক নন, তারা আসলে বিচারক। মাতিয়্যে দ্য সাঁ পল নামে এক অভিনেতা লিখেছিলেন, সেখানে আসতেন পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা আর শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। কিন্তু খাবারের সেই টেবিলগুলোতে তখন জমছিল অন্য এক উত্তাপ, রাজনীতির উত্তাপ। ১৭৮৯ সাল। ফ্রান্সে তখন বারুদ আর বিপ্লবের গন্ধ। বাস্তিল দুর্গের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ফরাসি সমাজব্যবস্থা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। একদিকে রাজপথে গিলোটিনে ঝরছে রক্ত, অন্যদিকে রান্নাঘরে তৈরি হচ্ছে নতুন ইতিহাস। বিপ্লবের ফলে অভিজাতরা দেশ ছেড়ে পালালেন। তাদের বিলাসবহুল রান্নাঘরগুলো বন্ধ হয়ে গেল। বেকার হয়ে পড়লেন শত শত দক্ষ বাবুর্চি। কিন্তু পেট তো আর বিপ্লব বোঝে না! এই বাবুর্চিরা তখন জীবিকার তাগিদে নিজেদের ছোট ছোট দোকান বা রেস্তোরাঁ খুলতে শুরু করলেন। সাধারণ মানুষ, যারা এতদিন কেবল রাজপ্রাসাদের খাবারের গল্প শুনে এসেছে, তারা এখন সেই রাজার বাবুর্চির হাতের রান্নাই খাওয়ার সুযোগ পেল। নাট্যকার লুই-সেবাস্তিয়ান মার্সিয়ার রসিকতা করে বলেছিলেন, “রান্নাঘরের বেদিগুলো এখন গিলোটিনের ঠিক পাশেই স্থাপিত হয়েছে।” এটি কেবল রসিকতা ছিল না, ছিল অমোঘ এক সত্য। বিপ্লবের সময় সংবিধান রচয়িতা থেকে শুরু করে সাধারণ বিপ্লবী, সবারই দরকার ছিল নিরিবিলি বসার জায়গা। রেস্তোরাঁগুলো হয়ে উঠল সেই জায়গা। ১৭৮৯ সালে যেখানে প্যারিসে রেস্তোরাঁ ছিল মাত্র ৫০টি, ১৮০৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ালো ৫০০-তে। ১৮৩৪ সাল নাগাদ সেই সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। রেস্তোরাঁর এই জয়যাত্রা কেবল উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফরাসিরা বরাবরই ভোজনরসিক, কিন্তু উনিশশ শতাব্দীতে খাবার হয়ে উঠল তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৮৫৫ সালে পিয়েরে-লুই দুভাল নামের এক কসাই চালু করলেন ‘বুইয়ঁ’ নামক এক ধারণা। এখানে খুব কম দামে মাংসের ঝোল আর সবজি পাওয়া যেত সাধারণ শ্রমিকদের জন্য। একে বলা যেতে পারে আজকের ‘ফাস্ট ফুড’ বা ‘সাশ্রয়ী খাবারের’ আদি রূপ। প্যারিসের বড় বড় রাস্তা বা বুলেভার্ডগুলোর ধারে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠল রেস্তোরাঁ। মানুষের রুচি বদলাতে শুরু করল। মার্সিয়ার তার ‘তাবলো দ্য পারি’ বইতে লিখেছিলেন, “একজন সাধারণ শ্রমিক, যে সামান্য টাকা আয় করে, সেও এখন রেস্তোরাঁয় গিয়ে বাঁধাকপির বদলে দামি মুরগির মাংস অর্ডার করে।” খাবার আর কেবল জীবনধারণের উপায় রইল না, তা হয়ে উঠল আভিজাত্য প্রকাশের মাধ্যম। ফরাসি শেফদের মধ্যে শুরু হলো তীব্র প্রতিযোগিতা। কে কত সৃজনশীল হতে পারে, কার পরিবেশনা কত সুন্দর, এ নিয়ে চলল লড়াই। এই প্রতিযোগিতার ফলশ্রুতিতেই ফরাসি রন্ধনশৈলী বা ‘ফ্রেঞ্চ কুইজিন’ বিশ্বজয় করতে বেরিয়ে পড়ল। ১৮৩৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে যখন প্রথম বিখ্যাত রেস্তোরাঁ দেলমোনিকো’স খোলা হলো, তার অনুপ্রেরণা ছিল সেই প্যারিসের আভিজাত্য। আজকের দিনে আমরা যখন কোনো রেস্তোরাঁয় বসে ঝকঝকে মেনু কার্ড উল্টাই বা ওয়েটারের মার্জিত ব্যবহার দেখি, তখন আমরা আসলে ফরাসি বিপ্লবের সেই উত্তরাধিকারই বহন করি। রোজে দ্য শঁতুয়াজো যে আরোগ্য বা উপশমকারী ঝোলের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজ এক বিশাল বিশ্বজনীন শিল্পে পরিণত হয়েছে। ফ্রান্স আমাদের শিখিয়েছে যে, খাবার মানে কেবল ক্ষুধা মেটানো নয়। খাবার মানে হলো একটি শিল্প, একটি রাজনৈতিক অধিকার এবং সর্বোপরি জীবনকে উদযাপন করার মাধ্যম। সতেরশ শতাব্দীর সেই অন্ধকার প্যারিস থেকে আজকের আলোকোজ্জ্বল ডাইনিং টেবিল, এই যাত্রাপথটি ছিল দীর্ঘ এবং নাটকীয়। প্যারিসের সেই উনুনগুলো যদি সেদিন না জ্বলত, তবে হয়তো আজকের পৃথিবীর স্বাদটা অন্যরকম হতো। সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক।